সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

ethics-education-kids.jpg

ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক প্রতিভা বিকাশে প্রশিক্ষকের ভূমিকা

একজন শিক্ষককে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতার দিক থেকেও আদর্শস্থানীয় হওয়া উচিত। পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষেরই দুই ডানা প্রয়োজন। এর একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি নীতি-নৈতিকতা।

পত্রিকা খুললে প্রায়ই শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী হেনস্থা কিংবা ছাত্রদের ওপর শিক্ষকের কঠোর আচরণের নানা খবরাখবর আমরা পাই। অথচ বাবা মায়ের পর শিক্ষকরাই হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের দ্বিতীয় প্রধান আশ্রয়স্থল বা ভরসার কেন্দ্র। তাই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক। যদিও ইদানিং এ সম্পর্কের অনেক উন্নতি ঘটেছে কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ও তিক্ত ঘটনাও অহরহ ঘটছে। অন্যদিকে শিক্ষককে অপদস্থ করার ঘটনাও কম নয়। এসবের পেছনে নৈতিক শিক্ষার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। এ জন্য বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাজীবনেই নৈতিক শিক্ষা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা আজকের ঘুনেঘরা সমাজের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।  

ইতিহাসের সব পর্যায়েই নবী-রাসূলরা মানুষের জন্য চূড়ান্ত কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। তারা ছিলেন-আদর্শ প্রশিক্ষক। মানুষ গড়ার এ কাজে তারা অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। সাধারণত: শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া মানুষের প্রতিভার বিকাশ ঘটে না। আর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করে থাকেন শিক্ষকেরা। আদর্শ শিক্ষক মানুষকে চূড়ান্ত কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতেও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোকিত অঙ্গনে প্রবেশ করে। শিক্ষকই একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানবৃক্ষকে অস্তিত্ব দেয়। এ কারণে একজন শিক্ষকের উচিত ছাত্রদেরকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া। সুশিক্ষিত না হলে একজন শিক্ষক সমাজকে সমস্যা ও দুর্দশার মুখে ঠেলে দিতে পারেন। এ কারণে ইসলাম ধর্মে শিক্ষকের ভূমিকার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

একজন শিক্ষককে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি আচার-আচরণ ও নীতি-নৈতিকতার দিক থেকেও আদর্শস্থানীয় হতে হবে। ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্কটা হলো আত্মিক। শিক্ষক তার ছাত্রদেরকে তার নিজের সন্তানের মতো মনে করেন এবং সে অনুযায়ী আচরণ করেন। আর এটাই হওয়া উচিত। বাবা ও মার পরেই যে ব্যক্তিটি শিশু-কিশোরদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন তিনি হলেন- শিক্ষক। এ কারণে শিক্ষকতা পেশা সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেউ যেন মনে না করে একাডেমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বরং এ সম্পর্ক শিক্ষক যতদিন বেঁছে থাকবেন ততদিনের।

শারীরিক ও আত্মিক-উভয় দিক থেকেই মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে জটিল সৃষ্টি। এ কারণে মহান সৃষ্টিকর্তাই মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়ার সর্বোত্তম পন্থা সম্পর্কে অবহিত। আর প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে ঐশী গ্রন্থ কোরআন, রাসূল(সা.) এবং আহলে বাইত(নবী বংশের ইমামরা)। ইসলামের দৃষ্টিতে, পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষেরই দুই ডানা প্রয়োজন। এর একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি ঈমান বা নীতি নৈতিকতা। যে শিক্ষকের ঈমান নেই তিনি শুধু তথ্য ও জ্ঞান দিয়ে ছাত্রদের সাহায্য করেন। ছাত্রের আত্মিক বিকাশ ও নৈতিক পূর্ণতার ক্ষেত্রে ঈমানহীন শিক্ষকের কোন ভূমিকা থাকে না।

আদর্শ শিক্ষকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো - 'বিনয়'। নবী বংশের অন্যতম সদস্য ইমাম সাদেক (আ.) শিক্ষকদের বিনয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, 'জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে বিনয়'। বিনয় হচ্ছে শিক্ষকদের সৌন্দর্য। একজন বিনয়ী শিক্ষক তার ছাত্রদেরকে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদি ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগ দেন। এর মাধ্যমে ছাত্ররা শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান শেখার পাশাপাশি বিনয়ী হওয়ার মতো সৎ গুনের দীক্ষাও নেন। যিনি বিনয়ী তিনি সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা রাখেন। ছাত্রদের সঙ্গে পরামর্শ করে চলার মানসিকতাও তিনি লালন করেন। বিনয় কখনোই একজন শিক্ষকের দুর্বলতা নয় বরং এটা তার এক বিশেষ গুণ। শিক্ষকের বিনয় ছাত্রদের মধ্যে আত্মিক প্রশান্তির জন্ম দেয়। যেহেতু অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছাত্ররা শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, সে কারণে শিক্ষকের জন্য দয়ার্দ্র ও উদার হওয়া জরুরি। কাজেই এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হবে যে, শিক্ষার্থীরা কেবল উপদেশের মাধ্যমে সংশোধিত ও আদর্শ হিসেবে গড়ে উঠে না বরং শিক্ষকের কথার পাশাপাশি তার কাজের গুরুত্বও এক্ষেত্রে অপরিসীম। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সুন্দর সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের আচরণ ও চিন্তা-বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষকের শত চেষ্টা সত্ত্বেও অনেক ছাত্র সঠিক পথে এগোয় না। কিন্তু তাতে শিক্ষককে ধৈর্য হারালে চলে না। এ কারণে একজন শিক্ষককে ধৈর্যশীল, নম্র ও ক্ষমাশীল হওয়া উচিত। ইমাম সাদেক (আ.)ও ছাত্রদের সঙ্গে সদাচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, " ছাত্রদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করবেন না। তাদের সঙ্গে দয়ার্দ্র ও সুন্দর আচরণ করতে হবে।" কারো ভুল-ত্রুটি খুঁজে না বেড়ানো ও তিরস্কার না করার পাশাপাশি ধৈর্য ধারণ ও ক্ষমা করার মতো গুণাবলী ধারণ করতে পারলে সবার সঙ্গে সদাচরণ সম্ভব।

অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক তার ছাত্রদের মধ্যে অন্যায় আচরণ লক্ষ্য করেন এবং অযৌক্তিক কথা শোনেন। এ জন্য ছাত্রকে বারবার তিরস্কার না করে তার ভেতর লুকিয়ে থাকা গুণাবলী আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে হবে। অল্প বয়সী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে দুষ্টুমি ও জেদের মাত্রা বেশি দেখা যায়। কিন্তু এসব শিশুর মাঝেই লুকিয়ে আছে ব্যাপক প্রতিভা। সে কারণে ছাত্রদের সঙ্গে সব সময় সুন্দর আচরণ করতে হবে। এতে ছাত্র ও শিক্ষক-উভয়ই উপকৃত হবে।

শিক্ষকদের অতি উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে মানব জাতির সবচেয়ে বড় শিক্ষক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)ও শিক্ষক হিসেবে গর্ব অনুভব করতেন। তিনি তাঁর অন্যতম দোয়ায় বলেছেন, "হে আল্লাহ! আপনি শিক্ষকদেরকে ক্ষমা করুন, তাদেরকে দান করুন দীর্ঘ জীবন।"

শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ খুবই সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়া। যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার জন্য যোগ্য শিক্ষকদের রয়েছে ব্যাপক গুরুত্ব। একজন যোগ্য শিক্ষকের রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। যেমন, ভাল শিক্ষক কখনও শিক্ষার্থী বা ছাত্রের ব্যক্তিত্বকে হেয় করেন না। ভাল শিক্ষক শিক্ষণের সময় ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ গড়ে তোলেন এবং কখনও কোনো ছাত্রকে অপমানজনক কথা বলেন না। এ ব্যাপারে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, "কাউকেই ছোট মনে করো না, কারণ, তাদের মধ্যে কম সম্মানিত ব্যক্তিও মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী।" একজন যোগ্য বা ভাল শিক্ষক কখনও ছাত্রদের মধ্যে বৈষম্য করেন না। মহানবী (সা.) বলেছেন, যেসব শিক্ষক ছাত্রদের মধ্যে বা শিষ্যদের মধ্যে বৈষম্য করেন, তারা আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থানকারী দুই গ্রুপের মধ্যে অন্যতম।

বিশ্বনবী (সা.) এর আহলে বাইত বা নবী বংশের অন্যতম সদস্য হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছাত্রদের শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য না করা ও সব ছাত্রকেই সমান চোখে দেখে সমপরিমাণ বা সমমানের শিক্ষা দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষার উপকরণগুলো সমানভাবে বণ্টন করাও এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষা নেয়া ও নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রেও শিক্ষককে বৈষম্য থেকে দূরে থাকতে হবে যাতে দুর্বল ছাত্রকে সনাক্ত করা যায়।

শিক্ষকের মধ্যে থাকতে হবে জ্ঞান, ধৈর্য, দয়া, ন্যায়বিচার ও অন্যান্য পছন্দনীয় গুণ। এ ছাড়াও তার মধ্যে থাকতে হবে ভালভাবে বোঝানোর ক্ষমতা বা দক্ষতা। মিষ্টভাষী হওয়া ও সদালাপী হওয়াও শিক্ষকের জন্য জরুরি। নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া উপযুক্ত শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব। ছাত্র বা শিষ্যদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নও তার লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্য হল ভাল গুণগুলোকে মানুষের জন্য স্বভাবে বা অভ্যাসে পরিণত করা। ভাল নৈতিক গুণগুলো যদি মানুষের বদ্ধমূল স্বভাবে পরিণত না হয় তাহলে সেগুলোর গুরুত্ব খুব একটা থাকে না। তাই এসব গুণকে স্বভাবে পরিণত করার জন্য বার বার অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষককেই। ভাল স্বভাব বা গুণকে জাগিয়ে তোলার জন্য সতর্ক করে দেয়া ও স্মরণ করিয়ে দেয়াও অত্যন্ত মোক্ষম পদ্ধতি।

আরেকটি দিক মনে রাখা জরুরি, শিক্ষক যতক্ষণ নিজেকে পরিশুদ্ধ, আত্মগঠিত ও আত্মসচেতন করতে সক্ষম নন, ততক্ষণ তার কথা বা ভাল উপদেশেও সুফল আশা করা অন্যায়। পবিত্র কোরআন আমাদের বলে, “তোমরা কেন সেকথা বল যা নিজে কর না?” তাই ভাল ও সুযোগ্য ছাত্র গড়ে তোলার জন্য আগে শিক্ষকদেরকেই উন্নত গুণ, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক যোগ্যতা অর্জন করা উচিত। এ ব্যাপারে ইরানের বর্তমান শীর্ষ ধর্মীয় নেতা খামেনেয়ি শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, 'ছাত্রদেরকে এটাও শেখানো দরকার নকল করে পাশ করলে সেই সার্টিফিকেট দেখিয়ে সারা জীবন ধরে সে যে অর্থ আয়-রোজগার করবে তা সবই হারাম বলে বিবেচিত হবে'।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Education, Ethics, Child, baby, Development, Right, Wrong, Allah, Brain