সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

baby-mirror.jpg

জনসেচেতনতা অটিজম সম্পর্কে জনসচেতনতা প্রয়োজন

কিন্তু সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে থাকা শিশুটির বিকাশের পথে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, আর তা যদি হয় ‘অটিজম’ তাহলে সেই পরিবারটির যে কি বিড়ম্বনা আর কষ্ট হতে পারে- তা কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারো অনুভব করার শক্তি নেই।

পরিবারে নতুন অতিথি আসছে। মা-বাবার পাশাপাশি দাদা-দাদী, নানা-নানী ছাড়াও অন্য সবার মধ্যে ব্যস্ততা। নতুন অতিথি ছেলে নাকি মেয়ে সেটা কোনো বিষয় নয়, সবারই আশা সন্তান হবে সুস্থ-স্বাভাবিক। যার আগমন সবাইকে শান্তি ও আনন্দ দিবে, নতুন বন্ধন সৃষ্টি করবে। 

নতুনের আগমনে সবাই আনন্দিত। ছোটো শিশুটি দিনে দিনে বড়ো হতে থাকলো; কিন্তু মা-বাবার চিন্তা শুরু হলো যখন তার বয়স দেড় বছর। এ সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের নজরে আসে তার সন্তানটি আচরণে কিছুটা ব্যতিক্রম। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পায় না তারা।

সন্তান বড়ো হয়ে গেলে মা-বাবার সময় কাটতে চায় না। ঘরে সব থাকলেও কিছু একটার বড়ো অভাব। মানুষের বয়স বাড়তে বাড়তে এমন সময় আসে যখন সে শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে। ছোটো-ছোটো শিশুরা তখন তাদের খুব প্রিয় হয়ে যায়। বাসায় সবাই বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দে দিন কাটায়। 

কিন্তু কখনো কখনো মা-বাবার পাশাপাশি অন্যরাও ঘরের ছোটো শিশুটিকে নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর এটি চোখে পড়ে যখন শিশুটির বয়স দেড় থেকে তিন বছর। শিশুটির আচরণে কেমন জানি ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। আশপাশের বাচ্চাদের সাথে কোথায় যেন গরমিল, কেমন জানি অস্থিরতা, স্বাভাবিক গতির মধ্যে কোথায় জানি জড়তা, সবমিলে আদরের সোনামণির জন্য দুশ্চিন্তা আর অশান্তি।

অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস হচ্ছে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের একটি জটিল প্রতিবন্ধকতা। বিশ্বে প্রায় প্রতি ১১০ জনে ১ জন শিশু এ সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে অটিজমের হার প্রায় ০.৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি হাজারে প্রায় ৮ জন। সাধারণত এদের শারীরিক গঠনে কোনোও ত্রুটি বা সমস্যা থাকে না। 

তাদের চেহারা ও অবয়ব অনেকটা অন্যান্য সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর মতোই। শিশুর প্রতিবন্ধকতা জন্মের দেড় বছর হতে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশু তার পরিবেশের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ করতে পারে না। নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। আচরণগত সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। 

একই কাজ বা আচরণ বার বার করতে থাকে। সঠিকভাবে ভাষার ব্যবহার করতে পারে না, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না, নিজের মতো করে থাকতে পছন্দ করে। অটিজমের কিছু কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে যা প্রায় সকল অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে দেখা যায় আবার প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রে আলাদা কিছু লক্ষণ থাকতে পারে। 

অটিজমে ছেলে বা মেয়ে যে-কোনো শিশুই আক্রান্ত হতে পারে। তবে মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় চার গুণ বেশি।

পরিবারে যখন একটি শিশুর জন্ম হয়, তখন তাকে ঘিরে হাজারো কল্পনা বা স্বপ্নের জাল বুনেন তার মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা। শিশুটিকে সুষ্ঠুভাবে লালনপালন করে মানুষ করার ব্যাপারে অনেক দায়িত্ব এসে পড়ে পরিবারটির ওপর। মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই অতি আনন্দের সাথে এ দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে এগিয়ে আসে। 

কিন্তু সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে থাকা শিশুটির বিকাশের পথে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, আর তা যদি হয় ‘অটিজম’ তাহলে সেই পরিবারটির যে কি বিড়ম্বনা আর কষ্ট হতে পারে- তা কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারো অনুভব করার শক্তি নেই। 

অটিজম নিয়ে জনসচেতনতার অভাবে তারা কি করবেন এটা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে না পেরে অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায়, উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েন। আর মা-বাবা যদি শিক্ষিত না হন তাহলে বিষয়টি নিজেদের অজান্তে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় রূপ নেয়।

দেশের গুটি কয়েক শহরে মাত্র কয়েকটি স্কুল এখন এদের সেবায় নিয়োজিত। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ “বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষেরও পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে”- এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ ঘোষণা করেছে। আমাদের সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘে গৃহীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। 

সে আলোকে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতার ধরন ও মাত্রানুসারে তাদের সেবা দেওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় শারীরিক, দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ১৯৬২ সাল থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। 

নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী বিশেষত অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার স্নায়বিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে সমাজের মূলধারায় আনয়নের লক্ষ্যে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ প্রণয়ন করার মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা বিষয়ক (অটিজম) এর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন। তিনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের সাথে যোগাযোগ রেখে অটিজম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে যদিও তা বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট নয়। 

সরকারের এ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের এগিয়ে আসার বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। জনগণের মধ্যে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি একান্ত জরুরি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের বাচ্চাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে দ্রুত। 

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগণ্ডলো যাতে আরও দ্রুত জনগণের জন্য সহজলভ্য হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণ আজ জনগণের সময়ের দাবি। তবে সবার আগে প্রয়োজন ‘সচেতনতা’, আর সহানুভূতি প্রদর্শন।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

অটিজম, শিশু, ভিন্ন-আচরণ, পরিবার, সচেতনতা