সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

neglected-child.jpg

শিশুদের প্রতি পৈশাচিকতা শিশুদের প্রতি এই পৈশাচিকতার শেষ কোথায়?

সত্যিকার্থে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর দায়িত্ব চেপে দিলে হবেনা, সরকারের প্রতি দায়িত্ব চেপে দিলে হবেনা।

বাংলাদেশে একের পর এক নির্মমভাবে শিশু হত্যাকান্ড মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। সে হিসেবে বর্তমানের বর্বরতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে অতিক্রম করে ফেলেছে। সম্প্রতি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকার ঘটনাগুলো হলো হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়া, বনশ্রীতে মায়ের হাতে দুই সন্তান খুন, পারিবারিক কলহের জের ধরে পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয় দুই শিশু; যারা সম্পর্কে ভাইবোন, সিরাজগঞ্জে মায়ের হাতে ১১ মাসের শিশু খুন, কিশোরগঞ্জে মায়ের হাতে শিশু খুন।

শিশুহত্যা যেভাবে বেড়েছে তা বিবেকবান মানুষদের ভাবিয়ে তুলছে। একটি শিশু জন্মের পর পরই যাকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে সেই মা-ই অাজ পরকীয়া, পারিবারিক কলহ ইত্যাদির জের ধরে শিশুহত্যা করছে। গতবছরের শেষ দিকে, পিটিয়ে শিশুহত্যার একটা উৎসব গেলো; এখন যেনো নতুন বছরের শুরুতে সেই উৎসব মায়ের হাতে শিশুহত্যার মাধ্যমে অারো বীভৎস রূপ ধারণ করেছে।

কিছুদিন অাগে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, "চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ৫০টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে৷ গত এক বছরে ২৯২টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে৷ আর গত চার বছরে সারাদেশে এক হাজার ৮৫টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।" 

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে (২০০৫ সালের রিপোর্ট অনুযাযী) বলা হয়েছে, “সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে শিশুহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। এ বছর হত্যার পাশাপাশি নৃশংসতাও বেড়েছে।” 

শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “শিশু ধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের পাশাপাশি বর্তমানে শিশুহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে নারী, শিশু-সংক্রান্ত মামলাসহ প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সংখ্যাটিও প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।” 

বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২৬৭টি সংগঠনের মোর্চা শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালে ২০০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৫০ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। গত বছরের সাত মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৯১ জনে, যেটি এ বছরে ২৯২ তে দাঁড়িয়েছে। 

এর অাগে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ৬ টি জাতীয় পত্রিকার খবর পর্যালোচনা করে ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০১৩’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে, বছরটিতে ২৬৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১২ জন। গুরুতর আহত হয় ২৩৯ জন শিশু। 

ধর্ষণ ছাড়া অন্যান্য যৌন নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয় ১৫০টি। তবে ২০১২ সালে ১৫৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। অর্থাৎ সংখ্যাটি না কমে বরং বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ঐ বছরটিতে ৯০ শিশু অপহরণের শিকার হয়। অপহরণের পর খুন করা হয় দুজনকে। পারিবারিক কলহ, মুক্তিপণ না পেয়ে, জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও মা-বাবার পরকীয়ার জেরে ৩৩৫ শিশু খুন হয়। 

অশ্লীল ভিডিওচিত্র ছড়ানোর ভয়ে বা অন্যান্য কারণে আত্মহত্যা করে ১৬৬ শিশু। বিভিন্ন অপরাধী কর্মকাণ্ডে ২৪৫ শিশুকে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১৭৬ জন। বছরটিতে পাচার হয় ৪২ শিশু। অ্যাসিডদগ্ধ হয় ১০ শিশু। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে ৪১ শিশু মারা যায়। ১০৭ শিশু গুরুতর আহত হয়।"

উপরোক্ত পরিসংখ্যান থেকে প্রমাণিত হয়, দেশে হু হু করে শিশুহত্যা ও শিশু নির্যাতন বেড়ে চলেছে। তার সাথে বেড়ে চলেছে সকল অন্যায় । এটাকে সমর্থণ করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ শহিদ মাহমুদ বলেন, “বর্তমানে শিশুহত্যার প্রক্রিয়া বীভৎস থেকে বীভৎসতর হচ্ছে।” 

শিশুদের প্রতি এই অন্যায়-অবিচার-পৈশাচিকতা যখন বেড়েই চলেছে তখন এর সমাধান কী? কেবলমাত্র সরকার, প্রশাসন সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বে নাকি সাধারণ মানুষকেও লড়তে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ। তিনি বলেন, “সমাজে এদের সংখ্যা কম। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে এদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।” (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো)

সত্যিকার্থে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর দায়িত্ব চেপে দিলে হবেনা, সরকারের প্রতি দায়িত্ব চেপে দিলে হবেনা। এই সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি আমাদেরও যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। ধর্ম আমাদের তাই শিখিয়েছে। 

অন্যায়ের ‍বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব । আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, “তোমরা শ্রেষ্ঠজাতি, বিশ্বমানবতার কল্যানের জন্য তোমাদের আবির্ভাব করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১১০)

আসুন শিশুদের প্রতি সকল অন্যায়-অবিচার-জুলুমের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, জাগ্রত হই, আন্দোলিত হই, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। কারণ, আজকের শিশুই আগামী নেতৃত্বের কর্ণধার। পৃথিবীকে তাদের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে কাঁধে কাঁধ রেখে কাজ করি। 

ছবিঃ ইন্টারনেট


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শিশু-হত্যা, পরিবার, মানবতা, সম্পর্ক, ভালোবাসা, নির্যাতন