সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

first-day-school.jpg

পিতা-মাতার সহজপাঠ স্কুলে পাঠানোর শুরুর দিন থেকে কী শেখাবেন সন্তানকে

সন্তানকে গড়ে তুলুন আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হিসাবে। আপনার স্বপ্ন পূরণে শতভাগ এগিয়ে দেবে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস ও সহজসাধ্য কিছু কাজ।

সন্তান মহান স্রষ্টার এক অপার অনুগ্রহ, পিতা-মাতার জন্য অমূল্য আশির্বাদ। জন্মের পূর্বে ও পরে আমাদের কত পরিকল্পনা থাকে সন্তানকে ঘিরে। হাজার রকম স্বপ্ন বুনি প্রিয় আত্মজ নিয়ে। কলিজার টুকরোর কাছে কত আশা, কত প্রত্যাশা মা-বাবার।

স্বপ্ন-প্রত্যাশা পূরণে শিশু বয়স থেকেই একটু একটু করে গড়ে তুলতে হবে সন্তানকে। আমাদের চারপাশের ছোট ছোট কিছু অভ্যাস আর সহজসাধ্য কিছু কাজ হতে পারে সন্তানের ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্নীল ভিত্তি। সামান্য একটু সচেতন হলেই আমরা পেতে পারি কাঙ্খিত সাফল্য।

ছোটবেলার ছোট্ট ছোট্ট বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে যাবে বড়বেলার বড় বড় স্বপ্ন পূরণের সোনালী সোপান। স্বপ্নসিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে যাক আপন সন্তান - এ প্রত্যাশা আমাদের সবার। স্বপ্ন দিয়ে স্বপ্ন গড়ুন, সহজভাবে স্বপ্ন পূরণ।

আমি হব সকাল বেলার পাখি,
সবার আগে উঠব আমি ডাকি।
-------------------------------
আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে মা-গো, রাত পোহাবে তবে।

এ এক অমোঘ স্বপ্নবাণী, আমরা সবাই জানি। আমাদের বাংলা সাহিত্যে উচ্চারিত শিশু-কিশোরদের জন্য এমন উন্নত শিক্ষাবাণী অনেক আছে, যা শিশুর সুপ্তসত্ত্বাকে প্রস্ফুটিত করার জন্য এক কার্যকর নিয়ামক হিসাবে কাজ করে আজীবন। নিজের কাজ নিজে করতে পারার আত্মবিশ্বাস একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি ও বাতাসের মতই অত্যন্ত জরুরি এবং তার অনন্য মানব সত্তার জন্য অপরিহার্য

যুগে যুগে যেসব মহৎ মানুষের অবদানে আজকের মানবজাতি, তাঁদের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রত্যেকেরই ছিল অসীম আত্মবিশ্বাস। একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী করে গড়ে তোলার জন্য শিশু বয়সের চেয়ে বোধ করি আর কোন উত্তম সময় নেই। এ যেন নিজ হাতে চারাগাছ পরিচর্যা করে হাস্যোজ্জ্বল ফুল ফোটানোর মতো উপযুক্ত সময়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে, কিভাবে আত্মবিশ্বাসী হিসাবে গড়ে তুলবেন আপনার শিশুকে। কোন দীক্ষা সন্তানকে করবে আত্মপ্রত্যয়ী? এর জন্য কি কোনো বিশেষ শিক্ষালয় আছে? নাকি আছে কোনো বিশেষজ্ঞ শিক্ষক?

দুঃচিন্তা করবেন না, উত্তরটা খুবই সহজ। আছে শিক্ষক, আর সেটা হল মা-বাবা। আছে শিক্ষালয়, শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে পিতা-মাতার চেয়ে আর কোন অনন্য শিক্ষালয় এ জগতে নেই। সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হিসাবে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর মা-বাবা। একটু দেখুন তো, নিচের ছোট ছোট কাজগুলো কি খুবই কঠিন হবে আপনার সন্তানের জন্য করার:
  • আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠাবেন। স্কুলের প্রথম বছরটা শিশুর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে যদি আপনার শিশুকে তার নিজের জু্তার ফিতে বাঁধা শিখিয়ে দিতে পারেন তাহলে তার যে মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হবে তা হয়তো আপনি বা আমরা কেউই কল্পনাও করতে পারব না। একবার ভাবুন তো, স্কুলে কখনো তার জুতার ফিতে খুলে গেলে সে যদি আর দশটা শিশুর সামনে নিজে নিজেই তার ফিতে বাঁধতে পারে তাহলে তার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস কোথায় গিয়ে ঠেকবে।
  • ছোট্ট একটি কাজ, স্কুলের ব্যাগ আপনি নিজে না গুছিয়ে আপনার শিশুকে গুছাতে দিন। আপনি শুধু খেয়াল করুন সে ঠিক ঠাক বই খাতা নিচ্ছে কি না, এতে ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে একটি গোছালো ব্যক্তিত্ব নিয়ে গড়ে উঠবে। কাজটি ছোট, কিন্তু আত্নপ্রত্যয়ী মানুষ হিসাবে গড়ে দেবে আপনার সন্তানকে।
  • শিশুর জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় ক্লাসে ফার্স্ট বা সেকেন্ড হওয়া, তাই সে ক্লাসে কী পারলো আর কী পারলো না সেটা নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন না হয়ে সে তার স্কুলটা উপভোগ করছে কিনা এবং আনন্দ পাচ্ছে কিনা অথবা স্কুলে গিয়ে অন্যদের সাথে মিশতে পারছে কিনা সেদিকে নজর দেয়া শিশুর শারীরিক ও মানসিক উভয়ের জন্যই উপকারী ও লক্ষণীয় দিক।
  • খেলনা, শিশুর আনন্দের উপকরণ। খেলনা নষ্ট করবে বাচ্চারা, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য বকাঝকা না করে বোঝানোর চেষ্টা করুন। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি তার ভেতরে খেলনাগুলো যত্ন নেয়ার বোধ সৃষ্টি করা যায়। খেলার পরে তার খেলনাগুলো আপনি বা কাজের লোককে দিয়ে না গুছিয়ে তাকে দিয়েই খেলার ছলে গুছিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। প্রথমদিক হয়তো কাজ হবে না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আপনার শিশুটি দেখবেন দায়িত্ববান হয়ে উঠেছে।
  • নিত্যদিন আমরা ছোট ছোট কিছু ভালো কাজ করে থাকি। ভালো কাজ করার সময় যতটা সম্ভব আপনার সন্তান সঙ্গে রাখুন। ভিক্ষুক বা কোথাও কোন কিছু দান করা সময় যতটা পারেন আপনার শিশুকে সাথে রাখুন, এতে তার মন উদার হবে। পৃথিবীকে সে আরও বেশি ভালবাসতে শিখবে।
  • সংসারে সমস্যা থাকবে, মান-অভিমান আসবে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে লক্ষ্য রাখবেন আপনার শিশুটি যেন এর ভুক্তভোগী না হয়। তার বাবা-মা এর মধ্যকার সম্পর্ক সে যেন সব সময় উপলব্ধি করে মধুর, যা তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত জীবনে সুখের ছায়া ফেলবে।
  • আপনার শিশুর মতামতকে তার সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে এমনভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন যেন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এতে তার আত্মশ্রদ্ধা বাড়বে। শিশুর মতামতকে তাচ্ছিল্যভাবে নিলে তার মনে হীনমন্যতা কাজ করবে, ভবিষ্যতে নিজেকে প্রকাশে দ্বিধা করবে।
  • সপ্তাহে অন্তত একটি দিন এবং ছুটির দিনগুলোতে আপনার শিশুকে একটু প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যান। তাকে ছেড়ে দিন খোলা হাওয়ায়, স্পর্শ করান মাটিকে। ধরতে দিন ফুলের উপর বসা রঙ্গিন প্রজাপ্রতিটি। দৌড় দিতে দিন, দিতে দিন ঝাঁপ। দেখবেন প্রকৃতির সান্নিধ্য আপনার শিশুর মাঝে এক অপূর্ব ভালো লাগার স্নিগ্ধতার ছাপ ফেলে যাবে যা আপনি হাজার বা লক্ষ টাকা খরচ করেও কোন সুপার শপ এ পাবেন না।
  • মোটামুটি পড়তে এবং লিখতে পারলে তাকে তার ব্যক্তিগত ডায়েরি লেখার বা আঁকার ব্যাপারে উৎসাহিত করুন। এতে সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শিখবে, অনুভব করতে শিখবে। নিজের কাছে আত্মসমালোচনার দ্বার হবে উন্মুক্ত।
  • পাঠ্যপুস্তকের বাইরে মজার মজার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে সে পুরো পৃথিবী নতুন করে চিনতে শিখবে। একটি সুন্দর মনোভাবের মানুষ হিসাবে গড়ে উঠবে। 
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে। আপনার শিশু আপনারই অস্তিত্ব, আপনার সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আপনার এই অংশটি যেন আগামী দিনে নিজের, সমাজের, পরিবারের, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার মত মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে সামর্থ্য থাকে সেটার দায়িত্ব একান্ত আপনার। আমাদের সন্তান হোক আগামী দিনের স্বপ্ন পূরণের উপজীব্য। পরিশেষে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়,

পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ সয়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া করে।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শিশু, শিক্ষা, বেড়ে-উঠা, লালনপালন, পিতা-মাতা, স্কুল, পড়ালেখা, জ্ঞান, সহজপাঠ, শিক্ষালয়, শিক্ষক, আত্মবিশ্বাসী